১৬ বছরে পা রাখলো ফেসবুক, জানুন সারাবিশ্বে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রম শুরুর খুব অল্প সময়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পূর্ণতা লাভ করেছে ফেসবুক। এখন বিশ্বব্যাপী ২৩২ কোটি মানুষ সক্রিয়ভাবে সাইটটি ব্যবহার করছেন। বিশ্বের জনপ্রিয় সোস্যাল মিডিয়া জায়ান্ট ফেসবুক গত সোমবার প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্ণ করে ১৬তে পদার্পণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পথচলার এ দীর্ঘ সময়ে ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত দুই বছর বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ফেসবুকের বিরুদ্ধে একাধিক তথ্য কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পায়।

যদিও এসব ঘটনার কারণে ফেসবুকের প্রবৃদ্ধি একটুও বাধাগ্রস্ত হয়নি। তীব্র বিতর্কের পরও ৩৪ বছর বয়সী মার্ক জাকারবার্গকে তার প্রজন্মের সবচেয়ে চৌকস উদ্যোক্তা মনে করা হচ্ছে। ২০১৮ সাল শেষে ফেসবুকের বাজারমূল্য ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ফেসবুকের এমন উত্থানের জন্য মার্ক জাকারবার্গের একক সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কিন্তু গত বছর একাধিক তথ্য কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশের পর ফেসবুক সিইওর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিনিয়োগকারীরা।

ফেসবুকের কার্যক্রম এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ফিচারের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প ও নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আরো বেশি মানুষকে সাইটটিতে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ। ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং সুবিধার পাশাপাশি সাইটটিতে যুক্ত হয়েছে যুগোপযোগী নিত্যনতুন সব ফিচার। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিজের নিরাপত্তা জানানোর মতো ফিচার যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারী বেড়েছে। ফেসবুকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও সমর্থন ফিচার চালু করেছে কর্তৃপক্ষ।

গত বছর ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা তথ্য কেলেঙ্কারি প্রকাশের পর সিইও পদ থেকে মার্ক জাকারবার্গের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। তবে বিনিয়োগকারীদের এমন দাবিতে গুরুত্ব না দিয়ে ফেসবুক প্ল্যাটফর্মকে আরো ঝুটঝামেলা মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। ফেসবুক সিইও এখন সিলিকন ভ্যালির অন্যতম টেক টাইটান। জাকারবার্গের উত্থান নিউইয়র্কের অদ‚রবর্তী ছোট গ্রাম ডবস ফেরি থেকে। তার বাবা এডওয়ার্ড ও মা কারেন জাকারবার্গ যথাক্রমে দাঁতের চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

রান্ডি, ডোনা ও এরিয়েলি নামে জাকারবার্গের আরো তিন ভাই-বোন আছেন। মার্ক জাকারবার্গ ১২ বছর বয়সে ‘জুকনেট’ নামে একটি মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিলেন। এ ছাড়াও, কিশোর বয়সেই বন্ধুদের জন্য কম্পিউটার গেমের কোড লিখেছিলেন তিনি। নিউ হ্যাম্পশায়ারে বিখ্যাত ফিলিপস এক্সটার একাডেমিতে হাইস্কুলে পড়ার সময়ই একটি মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। একেবারে শুরুর দিকের এ মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিনতে আগ্রহী ছিল এওএল এবং সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট। টিনএজার জাকারবার্গ ওই সময় নিজের প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম বিক্রি কিংবা কারো অধীনে চাকরিতে যোগ দিতে অনাগ্রহী ছিলেন।

মার্ক জাকারবার্গ শুধু কম্পিউটার কিংবা কোডিংয়েই পারদর্শী ছিলেন না। একই সঙ্গে ক্ল্যাসিকস পছন্দ করতেন তিনি। খেলাধুলার প্রতিও তার দুর্বলতা ছিল। হাইস্কুলে পড়া অবস্থায় একাডেমির ‘ফেন্সিং টিম’-এর ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। ২০০২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন মার্ক জাকারবার্গ। সেখানে তিনি দক্ষ ডেভেলপার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জাকারবার্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাপ ছিল ‘ফেস ম্যাশ’।

সহপাঠীদের ছবি ব্যবহার করে কে কতটা আকর্ষণীয়, তা নির্ধারণের অ্যাপ ছিল এটি। এ অ্যাপে স্কুল ডরমিটরির আইডি ফাইল থেকে হাতিয়ে নেয়া ছবি ব্যবহার করেন তিনি। অ্যাপটি চালুর প্রথম ৪ ঘণ্টায় সাড়ে ৪০০ মানুষ ২২ হাজার বারের বেশি ভিউ করেন। তবে কপিরাইট ও নিরাপত্তা ইস্যু কেন্দ্র করে হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ফেস ম্যাশ বন্ধের নির্দেশ দেয়। বেশ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক চালু করেন এবং নিজের সোস্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে পুরো সময় দেয়ার জন্য হার্ভার্ড ছেড়ে দেন।

হার্ভার্ড থেকে ড্রপআউট হওয়ার আগেই স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানের সঙ্গে এক পার্টিতে দেখা হয় মার্ক জাকারবার্গের। মার্ক জাকারবার্গ এখনকার মতো এতটা মার্জিত ছিলেন না। ফেসবুকের কার্যক্রম শুরুর পর তিনি ‘আই এম সিইও বিচ’ লেখা বিজনেস কার্ড নিয়ে ঘুরতেন। জাকারবার্গ ফেসবুকের কার্যক্রম শুরুর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১ কোটি ২৭ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিন ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে মার্ক জাকারবার্গের নাম ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাপী ২৩২ কোটি মানুষ এখন সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে। ফেসবুক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতি প্রান্তিকে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করছে। ২০১২ সালের ১৮ মে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় ফেসবুক। আইপিও ঘোষণার মাধ্যমে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের কোম্পানি হয় ফেসবুক। এর সুবাদে রাতারাতি বিশ্বের ২৯তম শীর্ষ ধনী ব্যক্তির আসনে অধিষ্ঠিত হন মার্ক জাকারবার্গ। ফেসবুক পাবলিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়ার পরদিনই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন চ্যান-জাকারবার্গ জুটি। বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তির বিয়ে সম্পন্ন হয় আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান ছাড়াই। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রিসিলা চ্যানকে নিজের ডিজাইন করা খুব সাধারণ রুবির আংটি পরিয়েছিলেন জাকারবার্গ। বিয়ের মঞ্চে হাঙ্গেরিয়ান শিপডগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রিসিলা চ্যান।

২০১১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আলতোয় ৭০ লাখ ডলারে ৫ হাজার ৬১৭ বর্গফুটের বাড়ি কিনেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। বাড়ি এবং এর আশপাশের নিরাপত্তায় সে সময় আরো ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেন তিনি। ২০১৪ সালের অক্টোবরে কাউয়াইয়ের হাওয়াই দ্বীপে ১০ কোটি ডলার ব্যয়ে ৭০০ একর জায়গা কিনেছিলেন জাকারবার্গ। এ জমি কিনতে গিয়ে দ্বীপটিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমির মালিকানায় থাকা অনেকের চক্ষুশূল হয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে মামলাও হয়েছিল। সান ফ্রান্সিসকোয় ১ কোটি ডলারে আরো একটি ম্যানশন কিনেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। এ ম্যানশনের ডিজাইন পরিবর্তনে অতিরিক্ত ১০ লাখ ডলার এবং গ্রিনহাউজ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় আরো ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেন তিনি।

ব্যবসায় পরিধি স¤প্রসারণের জন্য অধিগ্রহণে নিঃসংকাচে অর্থ ব্যয় করেন মার্ক জাকারবার্গ। তার উল্লেখযোগ্য অধিগ্রহণের মধ্যে রয়েছে ১০০ কোটি ডলারে ইনস্টাগ্রাম, ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে হোয়াটসঅ্যাপ ও ২০০ কোটি ডলারে অকুলাস অধিগ্রহণ। অর্থ থাকলে সবকিছু নিজের করে নেয়া যায় না, সে স্বাদ পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি ৩০০ কোটি ডলারে স্ন্যাপচ্যাট অধিগ্রহণের প্রস্তাব করেন। প্যারেন্ট কোম্পানি স্ন্যাপ ইনকরপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও ইভান স্পাইজেল তার সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।