সুখি হতে চাইলে, হতাশা ভুলে অবলম্বন করুন এই কৌশলগুলো

জীবন সুন্দর। বেঁচে থাকতে ভালবাসি আমরা সবাই। তবু জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন সবকিছু অর্থহীন মনে হয়! ক্যারিয়ারের ব্যর্থতা মানসিকভাবে দূর্বল করে দিতে পারে আপনাকে। মনে হতে পারে আর কোন আশা নেই, আলো নেই। যখন আপনি ডুবে আছেন হতাশার অন্ধকারে তখনো পৃথিবীতে বিরাজ করছে সম্ভাবনা। তাই মুখ তুলে তাকান। জীবনকে সাজান আবার নতুন করে। অবলম্বন করুন এই কৌশলগুলো-

আগামীকাল বলে কিছু নেই, এমনভাবে ঘুমান: আপনার শরীর একটি যন্ত্র। চমৎকার জটিল একটি যন্ত্র। আপনার কম্পিউটারটি যেমন সারাক্ষণ চালু রাখা যায় না, একে বিশ্রাম দিতে হয়, ঠিক তেমনি আপনার শরীরেরও প্রয়োজন বিশ্রামের। প্রতিরাতে নিজেকে নির্বিঘ্ন একটি ঘুম দিন। গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের সুন্দর ঘুম মস্তিষ্কে সারাদিনের জমে থাকা সকল টক্সিন দূর করে দেয়। এজন্যই প্রতিরাতে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুম আপনাকে তৈরি করে পরেরদিনের জন্য, আপনার মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যেও এটি খুব প্রয়োজন। প্রতিদিনের ঘুমের সময়ের সাথে আরও ৩০ মিনিট যোগ করুন। দেখবেন, আপনার কাজের গতি বেড়ে গেছে, কাজ করতে ভাল লাগছে, ফ্রেশ মস্তিষ্ক থেকে নতুন নতুন আইডিয়া আসছে।

মনোযোগ দিয়ে খাবার গ্রহণ করুন: খাওয়ার সময় শুধু খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া একটি অনুশীলনের বিষয়। বিশেষ করে তখন যখন আপনি এক হাতে খাবার গ্রহণ এবং অন্য হাতে ইমেইল বা ম্যাসেঞ্জারে উত্তর দিতে ব্যস্ত থাকেন। আপনি মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছেন মানে হল, আপনি প্রতিটি খাদ্য উপাদানের স্বাদ গ্রহণ করছেন। এতে আপনি কী গ্রহণ করছেন আর কী বাদ রয়ে গেল প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকা থেকে সে বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, মনোযোগ দিয়ে খাওয়া আপনার মন ভাল রাখে, স্ট্রেস কমায়, বাড়তি ওজন কমাতে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করে।

ক্যাফেইন ত্যাগ করুন: ক্যাফেইন সরাসরি আপনার নার্ভাস সিস্টেমের উপর প্রভাব ফেলে। এজন্যই কফি পান করলে আপনি তরতাজা অনুভব করেন, মস্তিষ্ক কাজ করছে বলে মনে হয়। কিন্তু আপনি যদি চরম হতাশাগ্রস্থ একজন মানুষ হোন এবং জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে থাকেন তাহলে এই সাময়িক সমাধান আপনার জন্য নয়। প্রাকৃতিক এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান গ্রহণ করুন। শরীরচর্চা করুন, ধ্যান করুন। সকালে এক মগ কফি আপনাকে যতটা সতেজতা দেবে ৩০ মিনিটের ব্যায়াম তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরি হবে।

আপনি কোথায় যাচ্ছেন জানেন তো: আমরা খুব বেশি হতাশ হয়ে পড়ি যখন বুঝিই না আমরা কী করছি। আপনি যা অর্জন করতে চাচ্ছেন তা কি আপনি নিজে জানেন? একজন বৈমানিক যদি তাঁর গন্তব্যস্থল না জানেন তাহলে কি তিনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন? আপনার লক্ষ্য-গন্তব্য প্রথমে জানুন, তারপর সেই দিকে কাজ করুন।

ভুল করুন: আপনার হয়তো পদোন্নতি হচ্ছে না কিংবা পেশাজীবনে সামনে এগোতে পারছেন না। ঝুঁকি নিয়ে নিজের গণ্ডির বাইরে কাজ করার চেষ্টা করুন। ভুল হওয়ার ঝুঁকি মেনে নিয়ে কাজ শুরু করুন। কাজ করলে ভুলের আশঙ্কা থাকবেই, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সামনে এগোনোর মনোভাব গড়ে তোলা উচিত আমাদের। আর পেশাজীবনের শুরুর দিকে বেশি ভুল করলে আপনার শেখার সুযোগ বেশি থাকে। ভুল থেকে শেখার মানসিকতা গড়ে তুলুন।

কর্মমূখী হোন: মনকে আবার জাগ্রত করুন, ফিরিয়ে আনুন কাজে। আপনি যখন হতাশাগ্রস্থ তখন কাজ ছেড়ে দিয়ে ব্যার্থতার সময়গুলোকে মনে করার কোন মানে নেই। এরচেয়ে বরং কাজ করুন। যখন আপনার চাকরি হচ্ছে না বা ব্যবসায় আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছেন না তখন এই সময়টাকে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজে লাগান। আবার নতুন করে নির্ধারণ করুন আপনার লক্ষ্য। ফোকাস করুন। সকাল শুরু করুন শরীরচর্চা দিয়ে। সফল মানুষেরা নিজেকে কর্মমূখী করেছেন সকাল থেকেই। ধীরে কাজ করা আপনার মস্তিষ্ককে ঝিমিয়ে দেয়। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট বেশী কাজ করতে শুরু করুন।

নীরবতার শান্তিকে গ্রহণ করুন: মনকে শান্ত করতে আমরা কত কি না করি। আপনার নানান দিকে খরচ করা টাকা এবং সময় উভয়ই বেঁচে যাবে আপনি যদি শান্তির জন্য সঠিক পথটি বেছে নিতে পারেন। মনের ক্ষত দূর করা, শান্ত-পরিশুদ্ধ করা, আবারও উজ্জ্বীবিত করার চাবি আছে আপনারই হাতে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় মেডিটেশন করেন তারা খুজে পান নিজের মাঝেই শান্তি বা ইনার পিস। প্রতিদিন অন্তত ৫ মিনিট মেডিটেশন আপনার পুরো দিনটিকেই ঝরঝরে উজ্জ্বল করে দেবে। রাতে ভাল ঘুম হবে, কমে যাবে উদ্বিগ্নতা, হতাশা। মস্তিষ্ক কাজ করবে আরও চমৎকারভাবে।

স্বাস্থ্যকর ত্বকের রুটিন: ত্বক ভাল থাকলে মনও ভাল থাকে। কিন্তু স্বাস্থ্যকর একটি অভ্যাস গড়ে তুলতে অনেক সময় প্রয়োজন। একটি অভ্যাস গড়ে তুলতে অন্তত ২১ দিন সময় লাগে। আপনি যদি সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে চান তাহলে কষ্ট করে নির্দিষ্ট সময়টিতে ২১ দিন উঠুন। এরপর আর কষ্ট হবে না। এমনিতেই ঘুম ভেঙ্গে যাবে আপনার। একইভাবে শরীরের সুস্থতা, ত্বকের যত্ন পরিণত হতে পারে একটি অভ্যাসে। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করুন। ত্বকের ধরণ বুঝে মনোযোগের সাথে এর যত্ন নিন।

অহমের জন্য নয় আত্মার শান্তির জন্য কাজ করুন: কাজ সেটাই করুন যেটা করতে আপনার ভাল লাগে। কোন কাজ করে আপনি সফলতার শিরোপা জয় করতে পারবেন বা বিখ্যাত হবেন সেই তৃষ্ণা থেকে কাজ না করে আত্মার তুষ্টির জন্য কাজ করুন। আপনার কাজ যখন আপনার মনে যোগ করবে শান্তি, আনন্দ তখন আপনি এমনিই ভাল থাকবেন। সফল হওয়া মানেই কোটিপতি হওয়া নয়। আপনি তখনি সফল যখন আপনি সন্তুষ্ট।

মনের কথা শুনুন: আমরা অনেক সময় টের পাই না আমাদের কী প্রয়োজন, কিন্তু টের পায় আমাদের শরীর। খুব ঘুম পাচ্ছে? ছোট একটি ন্যাপ নিন। দৈনন্দিন জীবন অসহ্য লাগছে? কোথাও ঘুরে আসুন। যখনই মনে হচ্ছে কিছু ঠিক নেই, তখনই নিজের মনকে জিজ্ঞেস করুন কী চাই! জীবন হোক উপভোগের, টিকে থাকার লড়াই নয়।

নিজেকে পুরস্কৃত করুন: আপনি হয়তো রাতের পর রাত জেগে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ পুরস্কার বা পদোন্নতি জুটছে না। এমন অবস্থায় হতাশা এড়ানোর জন্য নিজেকে নিজে পুরস্কৃত করতে শিখুন। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে নিজে উৎসাহ দিতে শিখুন। নিজের জন্য বই কিনতে পারেন, কিংবা অফিসের ডেস্কে ছোট্ট অ্যাকুরিয়ামে মাছ চাষ করতে পারেন। অন্যরা কে কী ভাবছে আপনাকে নিয়ে, তা না ভেবে কাজের দিকে মনোযোগ দিন।

জীবনের হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে জীবনকে দিন একটি নতুন শুরু। জেগে উঠুন। সবার আগে গুছিয়ে নিন আপনাকে। নিজেকে ভালোবেসে শুরু করুন আবার। গড়ে তুলুন সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী মানুষটিকে যাকে হারাতে পারবে না কেউ।

হতাশা দূর করার খাবার

মন খারাপ হলে পছন্দের জিনিস খাওয়া মন ভালো করার ভালো একটি উপায়। তবে খাওয়ার সময় ক্যালরির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। কম ক্যালরিতে মজার খাবার খেলে হতাশাও কিছুটা কমবে আবার শরীরে বাড়তি ক্যালরিও এড়ানো যাবে।

মধু ও দারুচিনি দিয়ে ওটমিল: ওটমিল খাওয়ার ফলে শরীরে সেরোটোনিন নামক একটি হরমোনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এ হরমোন মন ভালো রাখার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তাছাড়া কম ক্যালরির খাবার হিসেবেও দারুণ ওটমিল। ওটমিলের স্বাদ বাড়াতে যোগ করা যায় খানিকটা মধু। এতে চিনির শর্করা এড়ানো যাবে আবার স্বাদও বজায় থাকবে। এরপর উপরে খানিকটা দারুচিনি গুঁড়া ছিটিয়ে দিলে খাবারের সুগন্ধ স্বাদ দুটিই বাড়বে।

ডার্ক চকোলেট ও কাজু বাদাম: চকোলেট প্রেমীদের জন্য সুখবর, শরীরে যে হরমোনের কারণে হতাশা জন্মায় তার প্রভাব কমাতে কার্যকরী একটি খাবার হল ডার্ক চকলেট। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপও অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে ডার্ক চকলেট। অন্যদিকে কাজু বাদামের প্রোটিন শরীরের ক্লান্তিভাব দূর করে। আর ক্লান্তি দূর হলে মন ফুরফুরে হয়ে ওঠে।

মিষ্টি আলু: রক্তে শর্করার পরিমাণ না বাড়িয়ে মিষ্টি কিছু খাবার ইচ্ছা পূরণ করতে মিষ্টি আলুর জুরি নেই। তাছাড়া এর পুষ্টি উপাদান শক্তি জোগায়। তাই মন খারাপ থাকলে যদি মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে করে তাহলে মিষ্টি আলুর তৈরি খাবার খাওয়াই যায়।

টক দই ও ফল: শরীরের বাড়তি মেদ কমাতে টক দই দারুণ জনপ্রিয়। তাছাড়া ঘন টক দই যে কোনো ফলের সঙ্গে মিশিয়ে সুস্বাদু সালাদও বানানো যায়। আর দই খাওয়ার ফলে শরীরে ‘ফিল-গুড নিউরোট্রান্সমিটার’ বের হয়। অন্য দিকে ফলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হতাশা কমায় ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

তরকারি: ভারতসহ আমাদের এই অঞ্চলের তরকারিতে সাধারণত মরিচ ব্যবহার করা হয়। তাই দেশীয় ঘরানায় তৈরি সবজির তরকারি খেলে দুটি বিষয় ঘটে। প্রথমত মস্তিষ্কে মরিচের অণু সনাক্ত করা মাত্রই এনডরফিন বের হয় যা শান্ত করতে সহায়তা করে। আর কারি বা তরকারির মসলা মানসিক চাপের ঢাল হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরকারিতে ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ বাড়ায় পালংশাক যা মানসিক চাপ থেকে তৈরি মাথা ব্যাথায় আরাম দেয়।

গ্রিন টি: গ্রিন টি ওজন কমাতে কার্যকর। আর এর অ্যামাইনো এসিড মানসিক চাপ কমিয়ে আনতেও সাহায্য করে। তাই মন খারাপ থাকলে এবং হতাশার সময় গ্রিন টি পান করলে তা কমে আসতে পারে।

আপনার হতাশা কি আপনার সন্তানের মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলছে?

আমি প্রথম প্রচ্ছদে অভিভাবকত্ব এবং মানসিক সুস্থতার ওপরে একটি সুদৃঢ় সম্পর্কের বিবরণ দেব বলেছিলাম। তাই আমি এখানে শিশুদের মানসিক সুস্থতার উপর অভিভাবকদের হতাশার সম্ভাব্য প্রভাবগুলির বিষয়ে নিজের মতামত ব্যাক্ত করতে চাই।

একজন শিক্ষক তাঁর এক কিশোর (ষষ্ঠ শ্রেণীর) ছাত্রীকে পড়াশুনায় খারাপ ফলাফলের জন্য আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে সেই শিক্ষকের মনে হয়েছিল যে মেয়েটি অত্যন্ত অমনোযোগী এবং কোনও কিছুতে মন বসাতে পারেনা। সেই সঙ্গে এটিও মনে হয়েছিল যে মেয়েটির হয়তো অন্য কোন সমস্যা রয়েছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায়না। তাই সেই মেয়েটি আমার কাছে আসে এবং আমরা খুব সহজেই একে অপরকে বুঝতে পেরেছিলাম।

কিছু প্রশ্নোত্তরের পরেই মেয়েটি নিজের পায়ের উপরে পড়া কিছু ক্ষতচিহ্ন আমায় দেখায়। তার মা তাকে লোহার গরম রড দিয়ে মারেন। এটা জানার পর আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউন্সেলার হওয়া সত্বেও এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যা আপনাকে সম্পূর্ণ ভাবে স্তম্ভিত করে দেয়। আমিও একজন মা, আমারও প্রায় ওই বয়সী একটি মেয়ে আছে। আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে কি হচ্ছে।

এই সমস্যাটি আমার বেশ জটিল বলে মনে হয়েছিল। অনেক ভাবনাচিন্তা করার পর আমি সিধান্ত নিলাম যে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে জানার জন্যে আমি মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে দেখা করব। জানতে চাইব যে তাঁদের মেয়ে এমন কি দোষ করেছে যে তাঁর মা তাকে এই রকম কষ্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন?

অনেক ডাকাডাকির পরে ওঁনারা অবশেষে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমি তাদের কাছে জানতে পারি যে তারা দুজনেই চাকরি করতেন। তাঁদের মেয়ে পড়াশুনায় অবনতি হতে শুরু করে এবং তার মধ্যে লার্নিং ডিসেবিলিটি বা শেখার অক্ষমতা দেখা যায়। স্কুল থেকে তার মা-বাবা কে ডেকে পাঠানো হয় এবং তাঁদের বলা হয় মেয়েটির আলাদা করে যত্ন নিতে। এই জন্য স্কুল থেকে তার মায়ের উপর কিছুটা চাপও সৃষ্টি করে। শেষমেশ মেয়েটির মা হতাশ হয়ে বাধ্য হন নিজের চাকরি ছেড়ে তার মেয়ের উপর পুরোদমে মনোযোগ দিতে।

তাঁর হতাশার কারণগুলি ঠিক কী? তাকে শুধু তার মেয়ের জন্যই চাকরি ছাড়তে হয়নি, ছাড়তে হয়েছিল লিঙ্গ বৈষম্যের কারণেও। কেন একজন মা কে নিজের চাকরি জীবন উৎসর্গ করতে হবে? কেন একজন বাবা সেটি করতে পারেন না? তারপর রয়েছে আত্মমর্যাদার কারণ – চাকরি করে যে সম্মান পাওয়া যায়, তা অভিভাবকত্বে পাওয়া যায়না। এছাড়াও দাম্পত্য জীবনে অশান্তি। কেন তাঁর স্বামী তাকে জোর করেন চাকরি ছাড়ার জন্য? এছাড়া তাঁর শ্বশুর- শাশুড়ির প্রতিও রাগ কারণ তাঁরা এগিয়ে আসেননি মেয়ের দেখাশুনা করার জন্য।

এত সব দায়িত্ব, হয়তো এর চেয়েও বেশি, কিন্তু আমি শুধু এইটুকুই জানতে পারলাম তার কাছ থেকে। কারণ সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের পর তিনি আর আমার সাথে দেখা করেননি। এর মাসুল কাকে দিতে হচ্ছিল? ১৩ বছর বয়সী এক নির্দোষ মেয়েকে যে নিজেই জানত না যে তার মা তাকে কেন এতো ঘৃণা করে। মেয়েটি সবসময় ভয়ে থাকতো যে কখন তার মা তাকে শাস্তি দেবে। এই কারণেই সে শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণায় ভুগত। যেহেতু পারিবারিক কেচ্ছার কথা সে বাইরে কাউকে বলতে পারত না, তাই তার যন্ত্রণার ভারটা নেওয়ার জন্যেও কেউ এগিয়ে আসত না। তার পরিবারের জন্য সে নিজেকে অভিশাপ বলে মনে করত। এর পরে বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে আর কোনও সন্দেহ ছিলনা, যে কেন মেয়েটি স্কুলে এত অমনোযোগী।

সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের পর আমার সঙ্গে মেয়েটির আর দেখা হয়নি, কারণ তার মা-বাবা তার স্কুল পাল্টে দেয়। অনেক জোর করা সত্বেও তারা আর কেউই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। তাঁদের ধারণা ছিল স্কুলই সমস্যার কারণ, তাঁরা নন।

কিন্তু আমার মনে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল, যেগুলি এখন করতে চাই।

পরিস্থিতি কতটা বদলাত যদি মেয়েটির মা তার নিজের সমস্যা গুলি বুঝতে পারতেন? অনেক ক্ষোভ হওয়া সত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তার হতাশার কারণগুলি যথাযথ। কিন্তু তিনি যদি তাঁর ব্যাক্তিগত সমস্যালিকে সঠিক ভাবে সমাধান করার চেষ্টা করতেন তবে হয়ত তাঁর মেয়েকে এর সাজা পেতে হত না।

নিজের ব্যাক্তিগত হতাশার প্রভাব সন্তানের উপর ফেললে তার মানসিক সুস্থতার কি পরিণতি হতে পারে? আমার কাছে এর কোন সঠিক উত্তর নেই। তাই আমি শুধুই অনুমান করতে পারি। বড় হয়ে হয়ত মেয়েটির আত্মসম্মান বোধ তৈরি হবে না যা ভবিষ্যতে তাঁর ব্যাক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলবে। সে হয়ত কারোর উপর ভরসা করতে পারবে না। সে হয়ত নিজের ক্ষমতাগুলি পরীক্ষা করে দেখতে পারবে না। বড় হয়ে হয়ত সে আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এও হতে পারে, যে তার নিজের সন্তানকেও তার হতাশার মাসুল গুণতে বাধ্য করবে কারণ ভাল অভিভাবকত্বের উদাহরণ তাঁর জানা নেই।

আমরা জানি যে একজন মা তাঁর সন্তানকে সে ভাবেই মানুষ করে, যেভাবে সে নিজে বড় হয়েছে। যত শীঘ্র আমরা এই হিসেবটা বুঝতে পারব এবং সেটা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারব, তত শীঘ্র আমরা নিজেদের সন্তানকে ভাল রাখার উপাদানগুলি বুঝতে পারব। আসুন, নিজেদের সন্তানের মানসিক সুস্থতার কথা ভেবে নিজেরাই নিজেদের হতাশা গুলির সম্মুখিন হই। নিজেদের জন্যে নয়, সন্তানের কথা ভেবেই আমাদের এটি করতে হবে। হতাশ বা বিস্বাদ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। নানান কারণে হতাশ হয়ে পড়া খুবই সাধারণ এবং স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমাদের সচেতন হতে হবে, যাতে আমাদের হতাশাগুলি অন্যকে গ্রাস না করে ফেলে।

এখানে আমি যে উদাহরণটি দিলাম, তা হয়ত কিছুটা হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ের হতে পারে। আপনারা এটাও ভাবতে পারেন যে যেহেতু আপনাদের নিজেদের পরিস্থিতি এরকম নয় তাই এর গুরুত্ব আপনাদের কাছে কম। হ্যাঁ, এটি সত্যিই একটি চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘটনা। আর ঠিক সেই কারণেই ঘটনাটির কথা আমি আপনাদের জানাচ্ছি। আসলে কখনও কখনও কিছু বিষয়ের গুরুত্বটা বোঝার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের উদাহরণের প্রয়োজন হয়। হতাশা বা বিস্বাদ অনেক ভাবে দেখা দিতে পারে। একটি মহিলার কথা ভাবুন যিনি সদ্য তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন এবং তাঁর দুই কিশোর ছেলেমেয়ের সমস্ত দায়িত্ব একা নিতে হচ্ছে। অথবা আরেকজন মহিলার কথা ভেবে দেখুন যাকে নিজের পাঁচ পাঁচটি সন্তানের সমান ভাবে দেখাশুনো করতে হয়, কারণ তাঁর স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। অথবা একজন সৎ-মা যিনি সবসময় সংসারে নিজের মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্খায় নিজের সৎ-ছেলে বা সৎ-মেয়ের পড়াশুনার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত। ভেবে দেখুন একজন গৃহবধূর কথা যিনি ভয় পান যে তাঁর সন্তান ঘর ছেড়ে চলে যাবে, এবং তিনি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবেন।

হতাশা অনেক রকমেরই হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের হতাশাগুলি আমাদের নিজেকেই চিনতে ও বুঝতে শিখতে হবে। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের এই সকল হতাশা থেকে মুক্তি দেই।

সূত্র- দেহ